একটি দিন
একটি দিন
মেয়েটার জ্বর আর ছাড়ে না। কী যে ঘুসঘুসে জ্বর হয়েছে তা বোঝাও যায় না। রামরতনবাবু অস্থির হয়ে ওঠেন। রমা মেয়েটি আবার অবুঝ। রোজ সকালে উঠেই রামরতনবাবুকে বলে, ‘বাবা আজ কী খাব?’
উত্তর বাবাকে আর দিতে হয় না— মা ঝঙ্কার দিয়ে ওঠেন, ‘খাবি আবার কী? মেয়ের জ্বর তা যেন বোঝেন না। হাড়মাস আমার জ্বালিয়ে খেলে।’
রামরতনবাবু মৃদুস্বরে বলেন, ‘আহা ছেলেমানুষ ওকে অমন করে বকছ কেন? ওরে রমা এবার তোর জ্বর ছেড়ে যাবে রে। তার পর তোকে ভাত দেব। এই দেখ না আর কটা দিন।’
বাবার আশ্বাসবাণী শুনে রমার মুখে হাসি দেখা দেয়— বিছানার ওপরে উঠে বসে বলে, ‘হ্যাঁ বাবা তাড়াতাড়ি আমার জ্বর সেরে দাও না, তার পর—’
রমা তার কথা শেষ করতে পারে না। কথার মাঝেই মা বলেন, ‘হ্যাঁ গো, আজকে একটা ডাক্তার ডাকবে তো? আর তো পারা যায় না মেয়েটাকে নিয়ে। রোগে ভুগে ভুগে দেখ না মা আমার আধখানা হয়ে গেছে।’
রামরতনবাবু কোনও উত্তর দেন না। ওদিক থেকে বড় মেয়ে রানী ডাকে, ‘মা উনুন জ্বলে যাচ্ছে শিগগির এস— চায়ের জল হয়ে গেছে।’ সুরমার আর কথা বলা হয় না। মেয়ের ডাকে চলে যেতে হয়।
রানী চা এনে দেয়। রামরতনবাবু তাঁর হোমিওপাথি চিকিৎসার বই এবং বাক্স নিয়ে বসেন। সুতোবাঁধা চশমাটা চোখে লাগিয়ে বইটাতে গভীর মনোনিবেশ করেন। খানিকটা পড়ে মুখে তুলে জিজ্ঞাসা করেন, হ্যাঁ রে, তোর গায়ে-হাতে ব্যথা আছে?’
রমা মাথা নেড়ে জবাব দেয়, হ্যাঁ বাবা, খু-উ-ব।’
‘কই গো, এখনও যে বাজারে গেলে না?’ বলতে বলতে সুরমা এসে পড়ে। রামরতনবাবু যেন একটু থতমত খেয়ে গেছেন বলে মনে হয়। একদৃষ্টে কয়েক সেকেন্ড রামরতনবাবুর দিকে তাকিয়ে থেকে সুরমা বলে ‘কী নুড়োর চিকিচ্ছে হচ্ছে তোমার? এই একটু আগে কথা হল ডাক্তার আনবার জন্যে তা সব বুঝি গুলে খেয়ে ফেললে? আচ্ছা তুমি কি মেয়েটাকে মেরে ফেলতে চাও? তোমার ওই ছাই-এর চিনি খেয়ে কি ওই অসুখ সারে? এত সস্তায় যদি অসুখ-বিসুখ সারত, তা হলে পয়সা খরচ করে আর কেউ ডাক্তারি পড়ত না। তোমার ওই মুন্ডুর চিকিচ্ছে শিকেয় তুলে রাখ। যদি মেয়েটাকে বাঁচাতে চাও তো ডাক্তার ডাক।’ শেষের দিকে গলা ভারী হয়ে আসে। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলে সুরমা সশব্দে পা ফেলে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।
রামরতনবাবুর মনটা খারাপ হয়ে যায়। ডাক্তার ডাকতে তাঁর অসাধ, না সত্যই তিনি মেয়েটাকে মারতে চান? মাসের শেষ— এখন টাকা হাতে নেই। শুধু তো ডাক্তার ডাকলেই হল না, তার সঙ্গে দামি দামি ওষুধের দাম জোগাবেন কোথা থেকে? এ-মাসে আবার বাড়ির ট্যাক্স, ইনসিওরেন্স প্রিমিয়াম সব পড়ল এক সঙ্গে। রানীর বিয়ের জন্য তিনি ইনসিওর করেছেন। রানীর বয়স এখন বারো। বাংলাদেশে মেয়ের বিয়ে তো দিতেই হবে। সেই জন্য তিনি আগেই কাজ গুছিয়ে নিচ্ছেন। ভেতরে ভেতরে তিনি আবার নাকি পাত্রের চেষ্টাও করেন। যদি মেয়েটাকে কোনওক্রমে বাগদত্তা করে রাখা যায় তা হলে অনেকটা নিশ্চিত। এখন কেবল ভাবনা ছোট মেয়েটাকে নিয়ে। বারো মাসের মধ্যে ছ’মাস মেয়েটির অসুখ লেগেই আছে। একে তো দেখতে তেমন ভাল নয়, তার ওপর রোগে রোগে মেয়েটির শ্রী দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কী যে করবেন এটিকে নিয়ে— রামরতনবাবু আর ভেবে কূল কিনারা পান না। অগত্যা চটের থলিটা নিয়ে বাজারে চলে যান।
ঠিক অফিস যাওয়ার সময়টিতে বৃষ্টি নামে। এই টিপটিপুনি কেরানি-ভেজানো বৃষ্টি লোককে একেবারে জ্বালাতন করে মারে। এ যেন নিয়ম করে আসে। অফিস যাওয়ার সময়টাতে বৃষ্টি, তার পরেই ধরে যায়।
রামরতনবাবু কী আর করেন। অফিস তো যেতেই হবে। ছাতাটাকে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ করেন। হঠাৎ সুরমা বলে ওঠেন, ‘ডালিম আর কমলালেবু আনতে ভুলো না যেন। এবারে বড় মাগ্গি। ফলওলাগুলো যেন সব গলা কাটে। সেদিন ওই চাটুজ্যেরা কিনলে চার পয়সা জোড়া নেবু। তুমি তো পয়সা পয়সা বেশ নেবু আনো। ভুলো না যেন।’
রামরতনবাবু দ্বিতীয়বার রাস্তায় পা বাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে রানী বলে, ‘আজ আমার রিবন আনতে ভুলো না যেন। লাল রঙের আনবে, বুঝলে বাবা? আর যদি লাল না-পাও তো আসমানি। দাঁড়াও বাবা লিখে দিচ্ছি, নয় তো তুমি আবার ভুলে যাবে।’
একটুকরো সাদা কাগজে ‘লাল কিংবা আসমানি রিবন’ কথা কয়টি লিখে বাবাকে কাগজটা দেওয়ার জন্য বাইরে এসে রানী দেখে বাবা চলে গেছেন। রানীর মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। পরক্ষণে চৌকিটার দিকে চেয়ে রানী চিৎকার করে ওঠে, ‘মা বাবা খাবারের ডিবেটা ফেলে গেছে।’
সুরমা মাছ রান্না ফেলে তাড়াতাড়ি উঠে এসে বলেন, ‘যা, যা, দৌড়ে যা, এখনও বোধহয় মোড় পেরোয়নি, যা শিগগির যা। হ্যাঁ, শোন পেছনে ডাকিস না যেন।’
এক হাতে খাবারের ডিবে আর এক হাতে কাগজের টুকরোটা নিয়ে রানী দৌড়তে থাকে। রামরতনবাবুর একটু আস্তে চলা অভ্যেস। রানী গিয়ে একেবারে সামনে হাজির হয়। খাবারের ডিবেটা হাতে দিয়ে বলে, ‘বাবা তুমি খাবার ফেলে এসেছিলে কেন?’ ডিবেটা হাতে নিয়ে রামরতনবাবু বলেন, ‘যা, যা, বাড়ি যা, বৃষ্টিতে ভিজিসনি, অসুখ করবে।’
রানী ফিরে যায়। বাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই সুরমা বলে, ‘বৃষ্টিতে ভিজলি তো? তোরা আমার হাড়মাস জ্বালিয়ে খেয়ে তবে ছাড়বি। কেন, ছাতাটা নিয়ে যেতে কী হয়েছিল। ছাতা ছাতা করে তো প্রাণ অস্থির করে তুলছিল তখন। নতুন ছাতাটাকে তো এক বার মাথায় দিতে দেখলাম না এ পর্যন্ত।’
রানী মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে তাকে। তার যে কী দোষ হল, তা বুঝতে পারে না। ছাতা নেওয়ার সময়ই বা তখন কোথায়? দেরি হয়ে যাবে যে?
মাছের কড়াটা কলতলায় রাখার সময় সুরমার দৃষ্টি পড়ে মেয়ের হাতের দিকে— জিজ্ঞাসা করেন, ‘হাতে ওটা কী দেখি?’
রানী হাতের দিকে চেয়ে দেখে— ওই যা! সেই কাগজটাই দেওয়া হয়নি বাবাকে। বাবা নিশ্চয়ই ভুলে যাবেন রিবন আনতে— হয়ত বা নীল রঙের এনে হাজির করবেন। রানীর চোখের কোণে জল দেখা দেয়। কাগজটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে কাঁদতে থাকে।
কাগজের টুকরোর লেখা কয়টি পড়ে মা বললেন, ‘আজ না-হয় কাল হবে তাতে কাঁদিস কেন? একটুতেই মেয়ের আলগা চোখের পানি বেরিয়ে আসে।’
অফিস থেকে ফিরতে আজ রামরতনবাবুর একটু দেরি হয়। রানী বাবার জন্য পথ চেয়ে বসে থাকে। রমা বাবার প্রতীক্ষায় থেকে থেকে ঘুমিয়ে পড়ে। রানী বলে, ‘মা, বাবার আসতে আজ দেরি হচ্ছে কেন?’ সুরমা ছেঁড়া সেমিজটা সেলাই করতে করতে বলেন, ‘জানিনে বাপু।’ কার যেন জুতোর শব্দ শোনা যায়। অবশেষে রামরতনবাবু এসে পড়েন। হাতে তাঁর ফল তো নাই, রিবনও না। আছে কেবল একতাড়া কাগজ। রানী ছুটে আসে, ‘কই বাবা, আমার রিবন?’
বিরক্ত হয়ে রামরতনবাবু উত্তর দেন, ‘যা, যা, জ্বালাতন করিসনে বাপু। আমার কি মরবার সময় আছে? অফিসের কী কাজই না পড়েছে। নাকে দড়ি দিয়ে খাটিয়ে নিচ্ছে। আজ সাহেব কী বকুনি না দিলে। বাড়িতে কাজ এনে করতে হবে, এখন এত কাজ।’
সুরমা আর কোনও কথা জিজ্ঞাসা করে না। মুখ গম্ভীর করে থাকে। রামরতনবাবু ততক্ষণে কাগজের তাড়াটা আলমারির মাথায় রেখে হাত-পা ধুয়ে আসেন। সুরমা একটা রেকাবিতে করে একটা সন্দেশ, এক গ্লাস জল এনে হাতে দেয়। কোনও কথা বলে না। রামরতনবাবু জিজ্ঞাসা করেন, ‘আজ সমস্ত দিন রমা কেমন ছিল?’ বারুদে আগুন পড়লে যেমন হয়, সুরমা জ্বলে উঠে বলে, ‘তার সঙ্গে তোমার কী দরকার? তোমার কাছে তো তার বাঁচা-মরা দুই-ই সমান। মেয়েটির চিকিচ্ছে করাবে না, পথ্য দেবে না, ওকে তুমি মেরেই ফেলবে বলে ভেবেছ। আহা, মেয়েটা এত ফল ভালবাসে, তা একরত্তি ফল আনতে প্রবৃত্তি হল না?’
রামরতনবাবুর মেজাজও আজ তেমন ভাল থাকে না। অফিসে সাহেবের বকুনি খেয়ে অবধি তাঁর মন খরাপ। সুতরাং এক পশলা হয়ে যায়। অবশেষে সুরমা কেঁদে ফেলে। রামরতনবাবু আর বেশিদূর অগ্রসর হন না। আলমারির মাথা থেকে কাগজের তাড়াটা নিয়ে অফিসের কাজে বসে যান।
রানী বলে, ‘মা ভাত দাও না গো, বড় খিদে পেয়েছে।’ মা চিৎকার করে ওঠে, ‘আমায় খাবি রাক্ষসী। তোদের সব নুন গিলিয়ে মারতে হয়। সন্তান পেটে ধরা যে কত জন্মের পাপ— এমন কেউ যেন না-করে, তোদের জন্যই না আমার আজ এই দশা। বেরিয়ে যা আমার সামনে থেকে।’
রানী অবাক হয়ে যায়। এমন সময় ঝি এসে বলে, ‘দিদিমণি, কড়াটা বার করে দাও না, ততক্ষণে মাজি।’ কী জানি কেন রানীও রেগে ওঠে। ঝাঁঝের সুরে উত্তর দেয়, ‘যা, আমি পারব না, আমি তোর চাকর নই।’
অগত্যা সুরমাকেই উঠতে হয়। ঝি গজগজ করতে করতে কড়া মাজে। ভাত বেড়ে সুরমা রানীকে বলে, ‘যা বলগে যা, ভাত বাড়া হয়েছে।’ রানীকে আর বলতে হয় না। রামরতনবাবু উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ যাচ্ছি।’
খেতে খেতে রামরতনবাবু বলেন, ‘বাঃ, চিংড়ির ডালনাটা তো বেশ হয়েছে।’ অমনি সুরমা বলে ওঠে, ‘আর একটু দেব হ্যাঁ গা।’
রামরতনবাবু বলেন, ‘না না তোমাদের কম পড়বে।’ সুরমা বলে, ‘না গো না। খাবার মধ্যে কেবল আমি, নাও না আর একটু।’
কিছুক্ষণ নীরব থেকে রামরতনবাবু বলেন, ‘হ্যাঁ ভাল কথা, আজ সলিলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।’ সুরমা উৎসাহের সুরে বলে, ‘কী বলে সে? পাস-টাস দিতে পারবে না? তোমার চেহারা দিনকে দিন যা হচ্ছে তা আর চোখে দেখা যায় না, মেয়েটারও অসুখ। চল না গো এই সামনের পুজোর ছুটিতে মধুপুরে ঘুরে আসি? তুমি কী বল?’
রামরতনবাবু বলেন, হ্যাঁ, সে তো রেলের পাস দেবে বলেছে। কিন্তু, শুধু পাস দিলেই তো আর যাওয়া হয় না। চেঞ্জে যেতে কত খরচ।’
সুরমা জিজ্ঞাসা করে, ‘কত খরচ হিসেব করে দেখ না। আজ রাত্তিরেই হিসেব কর কেমন!’
রামরতনবাবু ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন।
সুরমা বলে, ‘আমি এক্ষুনি খেয়ে আসছি, তুমি ততক্ষণ কাগজ-পেন্সিল নিয়ে বস না?’
এতে রানীরও উৎসাহ দেখা দেয়, বলে, ‘হ্যাঁ বাবা চল না বেড়াতে অন্য কোথাও, কলকাতা যেন পুরনো হয়ে গেছে। হ্যাঁ মা, চল না?’
‘কত দিন যে রেলে চড়িনি!’
খাওয়াদাওয়া সেরে সুরমা ঘরে গিয়ে দেখে রামরতনবাবু অঘোরে ঘুমোচ্ছেন।
রানী বলে, ‘মা, দেখলে মা, বাবা আর হিসেব করলে না।’
সুরমা বলে, ‘চুপ চুপ, চেঁচাসনি। সারাদিনের খাটুনির পর মানুষটাকে তোরা একটু ঘুমোতেও দিবি নে? যা গোলমাল করিসনি, শুয়ে পড়।’
.
২৪ এপ্রিল ১৯৮৮ আজকাল রবিবাসর-এ প্রকাশিত।
(প্রথম প্রকাশ তিরিশ বছর আগে ‘দেশ’ পত্রিকায়।)