LNCrawler

শতাব্দীর আর্তনাদ

হেমন্তর গল্প — www.ebanglalibrary.com · All chapters

শতাব্দীর আর্তনাদ

ভদ্রমহিলার শেষের উক্তিটা শুনে মেজাজটাকে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। চেঁচিয়ে উঠলাম রূঢ়কণ্ঠে। বললাম, কেন তখন থেকে বিরক্ত করছেন? বলছি তো আপনার ছেলের গানের ব্যাপারে কিছুই করতে পারব না। পারলেও করব না। গান ছাড়া আর কোনও লাইন নেই নাকি? যদি আরও অপমানিত হতে না-চান তো আর একটা কথাও বলবেন না। যান, বেরিয়ে যান।

আমার উত্তপ্ত মেজাজ দেখে ওঁর ছেলেও ভয় পেয়ে গেছে। সে তাড়াতাড়ি মাকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেল।

আমার কাছে ভদ্রমহিলা এসেছিলেন ছেলেকে গানে সুযোগ করে দেওয়ার আর্জি নিয়ে। আমি স্পষ্টই বলে দিলাম, সে-রকম কোনও সুযোগ আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। উত্তরে উনি একাধিক অনুরোধ জানাতে লাগলেন। শেষে বললেন, সকলের কাছে শুনি আপনি এ-ব্যাপারে খুব উদার। তাই অনেক আশা নিয়ে আপনার কাছে আসা। আর ইচ্ছে করলে আপনি সবই পারেন। এই শেষের কথাটা শুনেই মেজাজটা আমার একলাফে সপ্তমে চড়ে গিয়েছিল।

ভদ্রমহিলা বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম খুব বেশি অভদ্র ব্যবহার করে ফেলেছি। তখন নিজের ওপর একদম কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন ভুলটা বুঝতে পেরে নিজেই দরজার বাইরে ছুটে গেলাম। এগিয়ে গিয়ে ডাকলাম ওঁকে, শুনুন।

ভয়ে ভয়ে ছেলের হাত ধরে এগিয়ে এলেন ভদ্রমহিলা। বললাম, বিশ্বাস করুন, আমি ঠিক এ-ভাবে আপনাকে অপমান করতে চাইনি। কিন্তু হয়ে গেল আর কেন হল সেটা বলবার জন্যই আপনাকে আবার ডাকলাম। পুরো ঘটনাটা শোনার পর বুঝতে পারবেন এই অভদ্র আচরণের জন্য আমি কতটা দায়ী। তখন আমাকে যা খুশি বলে গালাগালি দিলেও আমি সব মাথা পেতে নেব।

উনি আমার কথায় ফিরে এলেন। ওঁকে সামনের সোফাটায় বসিয়ে আমি বলতে শুরু করলাম।

যে-ছেলেটির কথা আপনাকে শোনাব তার নাম ইমন। ইমনকল্যাণ চৌধুরি। মনে আছে প্রথম যেদিন আমার কাছে এল, ওর নাম শুনে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এ নাম তুমি নিজে নিয়েছ না বাবা-মার দেওয়া নাম?

ও হেসে বলেছিল, এ-নাম আমার ঠাকুর্দার দেওয়া। উনি গানবাজনা খুব ভালবাসেন। বাড়িতে ওস্তাদজির কাছে এককালে গানও শিখেছিলেন। তার পর তো সব চলে গেল।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইমন। আমি আর এ-ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না।

আমার কাছে যখন প্রথম আসে তখন ওর বয়স বাইশ-তেইশ বছর। সুন্দর চেহারা। যেমন স্বাস্থ্য তেমনি রঙ। মাঝারি হাইট। শুধু কথাবার্তা আর চলাফেরাটা মেয়েলি ধাঁচের। গলাটাও সরু।

ভীষণ গান-পাগল ছেলেটা। আমার খুব ভক্ত। আমার গান ছাড়া আর কারও গান শোনে না। এক দিন আমি ওকে বলেছিলাম, এটা তো ঠিক নয়। সকলের গানই শোনা উচিত। এই যেমন সব লেখকের লেখা না-পড়লে ভালমন্দ বুঝবে কী করে! আর তা ছাড়া প্রত্যেকটার স্বাদই আলাদা। চেখে দেখতে ইচ্ছে করা তো খুবই স্বাভাবিক।

এর উত্তরে ইমন বলেছিল, রূপে-গুণে সুন্দরী মেয়ের তো অভাব নেই। কিন্তু, বিয়ে তো হয় একজনেরই সঙ্গে।

ওর কথায় হেসে ফেলেছিলাম। তার পর হাসি থামিয়ে বলেছিলাম, তার মানে তুমি গানের প্রেমে না-পড়ে গায়কের প্রেমে পড়তে চাও।

উত্তরে ইমন উজ্জ্বল হেসে বলেছিল, ঠিক তাই।

ইমন আমাকে গান শুনিয়েছিল। মোটামুটি গাইতে পারে। তবে, তেমন কোনও সম্ভাবনা দেখিনি। তাই বলেছিলাম, ঠিক আছে, গেয়ে যাও। এখনও ঠিক তৈরি হয়নি গলা।

আমার কথায় উৎফুল্ল হয়ে বলেছিল, আপনার আশীর্বাদ পেলে আমি ঠিক তৈরি করে নেব নিজেকে।

এর পর প্রায় রোজই আসত আমার কাছে ইমন। ছেলেটিকে আমি ভালবেসে ফেলেছিলাম। এক দিন এসে বলল, কিছু কাজ দিন হেমন্তদা। আপনার কোনও কাজ করতে পারলে আমি দারুণ খুশি হব।

বললাম, তোমাকে খুশি করার মতো কোনও কাজ তো হাতে নেই এখন।

আমার কথায় ইমন অল্প হেসে বলল, আমি কী কাজ চাইছি বলুন তো?

বললাম, কী আবার গান গাইতে চাইছ। ছবির গানে কোরাসে চান্স চাইছ? এটাই তো সবাই চায় আমার কাছে।

ও হাত নাড়তে নাড়তে বললে, না না, আমি সে-কাজের কথা বলছি না। ও-কাজ আপনি খুশি হলে দেবেন, না-হলে দেবেন না। আমি আপনার কোনও ব্যক্তিগত ফাইফরমাশ খাটতে চাইছি। এটা পেলেই আমার আনন্দ।

উত্তরে আমি বললাম, বেশ, তা হলে তুমি আমার সঙ্গে ঘোরো। কোনও কিছু দরকার পড়লে তোমাকে দিয়ে খাটিয়ে নেব। তবে হ্যাঁ, রোজ নয়। যেদিন বলব সেদিন আসবে।

শুনে তো আনন্দে লাফিয়ে উঠল ইমন। বললে, আমি আজ ধন্য হেমন্তদা। আপনার সঙ্গে ঘোরার অনুমতি দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন। এটাই আমি চাইছিলাম। কিন্তু, মুখ ফুটে স্পষ্ট বলতে পারছিলাম না। বলতে বলতে আমার পায়ের ওপর পড়ে লুটোপুটি খেতে লাগল যেন। আমি ওকে টেনে তুলে বললাম, এতটা উচ্ছ্বাস ভাল নয়।

কেন হেমন্তদা? — অবাক চাউনি ইমনের।

বললাম, এ-ধরনের উচ্ছ্বাসের আয়ু বড় অল্প। আমার অভিজ্ঞতা থেকে কথাটা বলছি।

ইমন প্রথমে মুষড়ে পড়ল আমার কথায়। কিন্তু, তার পরই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বললে, ঠিক আছে। আপনি মিলিয়ে নেবেন। আমার ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা খাটবে না। সজ্ঞানে আমি কোনওদিন আমার মত পরিবর্তন করব না। আজ যেমন দেখছেন চিরকাল তাই দেখবেন। আমি আপনাকে ছাড়ছি না।

আমিও ওকে ছাড়তে চাইনি। তখন ওকে আমার ভাল লেগে গেছে। নিজের থেকেই আমার অনেক কাজ করে দিত। এক খবর দেওয়া, ওকে ডেকে আনা। তখন আমি কয়েকটা কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সে-ব্যাপারে কিছু কিছু কাজ করতে হত। ইমনকে দিয়ে এই সব কাজ সামলাতাম।

এই সব কাজ করতে পেরেও খুব খুশি। সারাদিন টো টো করে ঘুরেও এতটুকু ক্লান্ত হত না। তার ওপর আমার সঙ্গে ঘোরা তো ছিলই। তখন ওর মুখে খুশির জোয়ার নামত।

তখন ফিল্মের কোরাস গানে ওকে গাওয়াতাম। তাতেই ও ধন্য। আমাকে মাঝে মাঝে বলত, তা হলে আমি এখন গানের আর্টিস্ট বলতে পারি। সবই আপনার দয়ায়।

এইভাবে কয়েক বছর কাটল। ইমন একইভাবে চলতে লাগল। একটুও বদলাল না।

আমি এক দিন ওকে বললাম, এ-ভাবে আর কতদিন চালাবে? নিজের ভবিষ্যতের কথা কিছু ভাবছ?

ইমন একগাল হেসে বললে, ভবিষ্যতের কথা আমি আর কী ভাবব। আপনি তো আছেন।

বললাম, আমি আছি বলে তোমার আর কতটুকু লাভ হচ্ছে। গান গেয়ে তো পেট ভরবে না। এইবেলা একটা চাকরির চেষ্টা কর।

আমার কথা শুনে মাথা নিচু করে কয়েক মিনিট চুপ করে থাকল ইমন। তার পর ধীরে ধীরে মাথা তুলে আমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে বললে হেমন্তদা, গানই আমার ধ্যানজ্ঞান। চাকরি করলে সাধনায় ব্যাঘাত ঘটবে। তখন আর কতটুকু সময় দিতে পারব এদিকে।

এর উত্তরে আমি ওকে বোঝালাম বেশ মেনে নিলাম গান তোমার ধ্যানজ্ঞান। অন্য কিছু বলে আমি তোমাকে নিরাশ করতে চাই না। ধরে নিচ্ছি তুমি গান গেয়ে এক দিন নাম করবে। কিন্তু, চাকরি করে গান করা যায় না?

উত্তরে ইমন বললে, যায়, কিন্তু নিষ্ঠা বা একাগ্রতার অভাব হয়। তাতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না।

আমি বললাম, কে বললে যায় না? তোমার চোখের সামনেই তো একজন নামকরা শিল্পী আছেন। তিনি নিয়মিত আপিস করেন।

কে হেমন্তদা? ইমনের জিজ্ঞাসা।

কেন, দেবব্রত বিশ্বাস। যাঁকে সবাই জর্জ বিশ্বাস বলে ডাকে। আমি ওঁকে কাকা বলি। রবীন্দ্রসঙ্গীতে ওঁর সমকক্ষ কেউ নেই। অথচ চাকরি তো উনি ছাড়েননি। কেমন মোটরবাইকে চড়ে আপিস যাচ্ছেন-আসছেন। আবার এই মানুষই জলসায় গান গাইছেন। গাদা গাদা রেকর্ড করছেন। ফিল্মে প্লে ব্যাক করছেন। চাকরি করেও নাম করতে ওঁর অসুবিধে হয়েছে কি?

এতটা বলে একটু থামলাম। তার পর বললাম, উনি ছাড়া আরও অনেক শিল্পী চাকরি করে গান করেন। তা ছাড়া তুমি তো এখনও কিছু করতে পারনি। আগে শিল্পী হিসেবে কিছু কর। তার পর না-হয় চাকরি ছেড়ে দিও।

এ-কথায় ইমন মাথাটা নিচু করে খুব খাদে গলা নামিয়ে বললে, হেমন্তদা, চাকরি কোথায় পাওয়া যায়, কীভাবে পাওয়া যায় আমার কোনও ধারণাই নেই। কারণ, এখনও পর্যন্ত আমাদের বংশে কেউ চাকরি করেননি।

ওর কথায় কিছুটা নিশ্চিত হলাম। বুঝলাম বিত্তবান ঘরের ছেলে। অতএব রোজগার না-করলেও খাওয়া-পরার ভাবনা নেই। তাই ওকে উৎসাহই দিলাম, তবে আর কী। চুটিয়ে গান কর। প্রায় খুলে গেয়ে যাও। ভাগ্যে থাকলে অনেক কিছুই হতে পারে।

আমার কথায় খুশিতে মুখ ভরে উঠল ইমনের। চটপট আমার পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, আপনার আশীর্বাদ থাকলে আমার সব হবে। এ-বিশ্বাস আমার আছে।

এর পর কয়েকদিন বেপাত্তা হল ইমন। তার পর এক দিন সকালে হাসতে হাসতে হাজির হল আমার সামনে। এসেই একেবারে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম। প্রণাম সেরে উঠে বললে, বর্ধমানে একটা ফাংশানে গান গেয়ে এলাম, হেমন্তদা। আমারই এক বন্ধু সুযোগটা করে দিল। আপনারই বাছাই বাছাই কয়েকটা গান গাইলাম। খুব হাততালি। ওরা তো বললে, দারুণ গেয়েছি। একটানা এতগুলো কথা বলে থামল ইমন।

জিজ্ঞাসা করলাম, তা গান গেয়ে কিছু রোজগার হল?

উত্তরে ইমন আমতা আমতা করে বললে, না, টাকাপয়সা কিছু দেয়নি। গান গাইতে দিয়েছে এটাই তো যথেষ্ট। নইলে আমার মতো শিল্পীকে কে আর চান্স দেবে বলুন? তবে হ্যাঁ, গাড়ি ভাড়া দিয়েছে। আর খাওয়া-দাওয়া। এখন এর বেশি আমি আশা করি কী করে বলুন?

মনে মনে হাসলাম। দুঃখের হাসি। মুখে বললাম, গানই গাও আর যাই কর, বাঁচতে গেলে টাকার ভীষণ প্রয়োজন। এখন বুঝছ না। পরে হাড়ে হাড়ে বুঝবে।

ইমন ইতস্তত ভঙ্গিতে বললে, এখন তো আমি নতুন। একটু নাম হোক। তখন কিছু কিছু আয় হবে নিশ্চয়ই।

তার পরই হাত কচলাতে কচলাতে বললে, আপনি যদি আমার একটা রেকর্ড করিয়ে দিতে পারেন তা হলে ফাংশানে প্রোগ্রাম পাওয়ার খুব সুবিধে হবে। পারবেন হেমন্তদা, একটা রেকর্ড করিয়ে দিতে?

ওর কথায় আমার মুখের রেখা পাল্টে গেল। গম্ভীর গলায় বললাম, আমি তো রেকর্ড কোম্পানির মালিক নই যে চাইলেই তোমার রেকর্ড হয়ে যাবে। তা হলে তো কোনও ভাবনাই ছিল না। আমার ভাইবোন, যত আত্মীয়স্বজন সকলের রেকর্ড হয়ে যেত।

আমার কথা শুনে বেশ চুপসে গেল ইমন। কিন্তু, মাত্র মিনিট কয়েক। তার পরই হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়াবার মতো ভঙ্গিতে বললে, ঠিক আছে। ঘাবড়াবেন না। যদি ধরুন নাম করে ফেলতে পারি তা হলে তো নিশ্চয়ই রেকর্ড হবে।

বললাম, নাম করতে পারলে সবই হবে। সেটা করে দেখাও আগে।

এর পর বেশ কিছুদিন ডুব মারল ইমন। তার পর যেদিন এল সেদিন সোফায় বসে পড়ে হতাশ কণ্ঠে বললে, না হল না।

জিজ্ঞাসা করলাম, কী হল না?

বললে, রেকর্ড। তার পর নিজেই বললে, একটা ছোটখাট রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে ব্যবস্থা করে ফেলেছিলাম। টাকা দিলে রেকর্ড করে দেবে। মার কাছে টাকা চাইলাম। মা দিল না। ক্যাশ শর্ট। দেখি কী হয়।

সেদিনই ইমনের সম্বন্ধে অনেক কথা জানলাম। ওদের বাড়ি বর্ধমানে। ওর বউ আছে। একটা ছেলেও আছে। এককালে জমিদারি ছিল। এখন পড়তি অবস্থা। মা, বউ, ছেলে বর্ধমানে থাকে। ও কলকাতায় মামার কাছে থাকে। মামার অবস্থা মোটামুটি ভাল। তবে, সম্প্রতি ব্যবসায় মোটা লোকসান হওয়াতে একটু ভেঙে পড়েছেন। এই পর্যন্ত জেনেছিলাম ইমনের সম্বন্ধে।

কিন্তু তখন কি জানতাম, এ-জানাই শেষ নয়। আরও অনেক কিছু জানতে, শুনতে হবে ইমনের সম্বন্ধে।

তখন প্রায়ই ও আমার কাছে এসে গানের কাজ চাইত। আমিও ওকে যথাসাধ্য চেষ্টা করতাম কোরাস গানে চান্স দিতে। তাতে কিছু করে টাকা পেত। মাঝে মাঝে অবশ্য বিরক্ত করত সোলো গানের জন্য। ওকে বুঝিয়ে বলতাম, দেখ ইমন, তোমার যা যোগ্যতা তাতে কোরাস ছাড়া আর কিছু পেতে পার না।

ও উত্তরে বলত, আপনি ইচ্ছে করলে পারেন। অন্য কেই এ-কথা বললে রেগে যেতাম। কিন্তু, ইমনকে তখন ভালবেসে ফেলেছি। তাই রাগ না-করে ওকে আসল অসুবিধেটা বললাম। বুঝিয়ে বললাম, তোমরা ভাব মিউজিক ডিরেক্টর ইচ্ছে করলে যাকে-তাকে দিয়ে গানের প্লে ব্যাক করাতে পারে। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আমার ওপরে ডিরেক্টর আছেন, প্রাোডিউসার আছেন। তাঁরা চান নামকরা শিল্পীকে দিয়ে গান করাতে। তারও কারণ আছে। নামকরা শিল্পীকে দিয়ে গান করালে গ্রামোফোন রেকর্ড বেশি বিক্রি হবে। ওর ওপর প্রাোডিউসার রয়েলটি পাবেন। তা তিনি এ-লাভ ছাড়বেন কেন? তিনি তো টাকা ওড়াতে ছবি করতে নামেননি। তিনি ব্যবসা করতে টাকা ঢেলেছেন। তা হলে তিনি জেনেশুনে লোকসানের দিকে যাবেন কেন?

আমার কথা শুনে চুপ করে গেল ইমন। এর পর আর আমাকে বিরক্ত করেনি। কিন্তু, নাম করার জন্যে গানের পেছনে ছোটা বন্ধ করেনি। সেটা চালিয়ে গেছে আগের মতনই।

এর পর বেশ কিছুদিন বাদে এক দিন এল ইমন। শরীরটা দেখে মনে হল বেশ কাহিল। জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন আছ?

বললে, ভাল।

তার পরই হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা হেমন্তদা, এই যে আমি গানে নাম করতে চাইছি এটা অন্য লোক জেনে ফেলছে কী করে বলুন তো? এই যেমন ধরুন আমি মনে মনে যা করব ভাবছি সবাই আমার মনের কথা জেনে ফেলছে। আর এই জেনে ফেলাতেই হয়েছে আমার মুশকিল। আমি আর কিছু করতে পারছি না। এটা বন্ধ করা যায় কী করে বলুন তো?

এমন এলোমেলো প্রশ্নের কী উত্তর দেব? বুঝলাম চিন্তা করতে করতে ওর মনে ভাঙন শুরু হয়েছে। তাই কথার মোড় ঘোরাবার জন্যে বললাম, ও-সব আজেবাজে কথা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ কেন? তুমি শিল্পী, শুধু গান করে যাও। কারও কথায় কান দিও না।

এ-কথা শুনে ঝট করে আমার পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, আপনি বলছেন আমি একজন শিল্পী। অথচ দেখুন সেটা কেউ মানতে চায় না। যাক, আপনি যখন আমাকে শিল্পী বলেছেন তখন আর আমি কারও কথার পরোয়া করি না। দেখবেন আমি শিল্পী হয়ে আমার সংসারকে বাঁচাবই।

চলে গেল ইমন। এর পর আর আসেনি আমার কাছে। কিন্তু, এর ছ’মাস পরে এসেছিল আর একজন। বয়েস ছাব্বিশ কি সাতাশ। টকটকে গায়ের রঙ। এক কথায় যাকে বলে সুন্দরী।

কিন্তু, ওর চোখ জ্বলছিল যেন আগুনের মতো। আমাকেই জিজ্ঞাসা করল, আপনিই হেমন্ত মুখার্জি?

বললাম, হ্যাঁ, কেন?

তখনও ওর চোখে আগুন। সে-চোখ দিয়ে একরাশ নালিশ যেন শিখার মতো লকলক করছে। বললে, আমি ইমনের বউ শতাব্দী।

তার পরই ওর গলাটা গর্জে উঠল, জানেন আপনি আমার কতবড় সর্বনাশ করেছেন। কেন আপনি ওকে দিনের পর দিন প্রশ্রয় দিয়েছেন। কেন ওকে স্পষ্ট বলে দেননি গানের ব্যাপারে আপনি কিছু করতে পারবেন না। দূর দূর করে তাড়িয়ে দেননি কেন বাড়ি থেকে। তা করতে পারলে ওর এতবড় ক্ষতিটা হত না। বলতে বলতে শতাব্দী কান্নায় ভেঙে পড়ে বললে, আমার স্বামী পাগল হয়ে গেছে।

এতটা বলে আমি একটু থামলাম। তার পর ধরাধরা গলায় বললাম, ইমনের কথা মনে হলেই নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়। আজও যেন আমি শুনতে পাই শতাব্দীর সেই বিকট আর্তনাদ, কেন ওকে আপনি দিনের পর দিন প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। কেন ওকে স্পষ্ট বলে দেননি গানের ব্যাপারে আপনি কিছু করতে পারবেন না। দূর দূর করে ওকে তাড়িয়ে দেননি কেন বাড়ি থেকে?

আমার চোখজোড়া তখন ভিজে গেছে। সামনে তাকিয়ে দেখি ভদ্রমহিলার চোখেও জল। উনি সোজা উঠে এসে আমাকে প্রণাম করলেন। তার পর আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে নিঃশব্দে চলে গেলেন।

.

২৪ এপ্রিল ১৯৮৮ আজকাল রবিবাসর-এ প্রকাশিত।