ফলতা থেকে পলাশি
ফলতা থেকে পলাশি
১
সহসা কালো মেঘে ছেয়ে গেল পশ্চিমের আকাশ। এতক্ষণ যে সূর্যটা গনগনে উত্তাপ ছড়াচ্ছিল, কোথায় যেন হারিয়ে গেল! মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হল। শ্রাবণের বারিধারা। গঙ্গার ওপারের সবুজ ঝাপসা হয়ে গিয়েছে। প্রশস্ত নদীর বুকে অঝোরে ঝরে পড়া বৃষ্টির শব্দ ধীরে ধীরে বেশ জোরালো হয়ে উঠছে।
এই ঘোর বাদলের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে শুকনো কলাপাতায় মাথা ঢেকে এক ছুট্টে ঝাঁকড়া বটগাছের নীচে এসে আশ্রয় নিল, লরেন্স ও গ্রান্ট।
বিরক্তির সঙ্গে আকাশের দিকে চাইল লরেন্স। মেঘ বেশ জমাট। এ বৃষ্টি অনেকক্ষণ চলবে।
এই ঘেমো ভ্যাপসা গরমে জলে ভিজতে পারলে আরাম হতো ঠিকই, তবে বর্ষায় ভেজার বিলাসিতা তাদের এখন দেখালে চলবে না। জামাকাপড় সঙ্গে বড় একটা নেই। এখন ভিজলে, ভিজে কাপড় গায়েই শুকোতে হবে। ঠান্ডা-গরম লেগে শরীর অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। এমনিতেই তো বেঙ্গলে এসময়ে নানারকম অসুখ-বিসুখের উৎপাত। যেখানে নিজেকে সুস্থ রাখাই কঠিন সেখানে জলে ভিজে যেচে অসুখ বাঁধানোর কোনও মানে হয় না।
সেই সাতসকাল থেকে ঘর ছাওয়ার কাজে লেগেছে দুজনে। টিম লরেন্স ও জন গ্রান্ট দুই বন্ধু, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুই অখ্যাত কর্মচারী। সেই সমস্ত অগণিত সাধারণ মানুষের দুই প্রতিনিধি, ইতিহাস যাদের কথা লেখে না।
নদীর পাড়ে জায়গাটা কয়েক’দিন আগে আবিষ্কার করেছিল লরেন্স। বেশ উঁচু জায়গা, আকারে কাছিমের পিঠের মতো। জোয়ারের জলে ভেসে যাওয়ার ভয় নেই। ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানে বাঁশ দিয়ে ঘরের একটা কাঠামো খাড়া করেছে দুজনে। বাঁশের বাখারির খাঁচার উপর গোলপাতা বিছিয়ে ছাউনির কাজটা আজই শেষ হয়ে যেত, হঠাৎ বৃষ্টি আসায় সব গোলমাল হয়ে গেল।
চামড়ার পাত্রের ঢাকনা খুলে ঢকঢক করে গলায় খানিকটা জল ঢেলে পাত্রটা লরেন্সের দিকে এগিয়ে দেয় গ্রান্ট।
মুখ বিকৃত করে গ্রান্ট। এ জলের স্বাদ বিচ্ছিরি কষা। শরীরের কোনও আরাম হয় না। এ তো আর লালদিঘির মিষ্টি জল নয়, গঙ্গার জল। জীবাণু নষ্ট করে পরিশুদ্ধ করতে ফোটানো হয় রোজ। তারপর ঢেলে রাখা হয় বড় বড় জালায়। পেটের রোগ থেকে বাঁচতে এই ফোটানো স্বাদহীন জলই এখন ভরসা।
ইদানীং শোনা যাচ্ছে খাবারদাবার পর্যাপ্ত মজুত নেই। থাকার কথাও নয়। এমন যে একটা অবস্থার সৃষ্টি হবে লরেন্স তা আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিল। কালেটসাহেব আজ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এরপর রেশন করে খাবার মিলবে। পরিস্থিতির সঙ্গে সবাইকে মানিয়ে নিতে হবে। কত দিন ধরে যে এই ব্যবস্থা চলবে তা কেউ জানে না। বড়সাহেবরা শুধু স্তোকবাক্য দিয়ে যাচ্ছেন—একটু ধৈর্য ধরো সবাই। দক্ষিণ উপকূল থেকে সাহায্য আসবে। আমরা আবার কলকাতায় ফিরব। এসব কথা লরেন্স ও গ্রান্টের কানে আকাশকুসুম কল্পনার মতো শোনায়।
আরও অনেকের মতো লরেন্স ও গ্রান্টের কাছে গোটা জীবনটাই কেমন যেন বিস্বাদ হয়ে উঠেছে। একগাদা লোক মিলে জাহাজের ডেকে গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে থাকা। প্রাইভেসি নেই, আগল নেই। ঘুমের মধ্যে পাশ ফেরা যায় না। দুজনের মাঝে সামান্য ফাঁকটুকুও থাকে না। গায়ে গায়ে ঘষাঘষি লাগে, এ ওর ঘাড়ে পা তুলে দেয়। ঘুমের ঘোরে কারও হাত দমাস করে গিয়ে পড়ে আরেকজনের মুখের উপরে। ঘুমন্ত লোকটি হাউমাউ করে জেগে ওঠে। তারপরে বচসা বেঁধে যায়। বাকিদেরও ঘুম চৌপাট হয়। রাতের ঘুম তো নয়, যেন শাস্তি। নিত্যদিনের নরকযন্ত্রণা।
এর উপরে রয়েছে ডেকের উপর জায়গার দখল নিয়ে গোলমাল, ঝামেলা। একজনের জুত করে পাতা বিছানা আরেকজন ছুড়ে ফেলে দেয়। মাঝেমধ্যে এই নিয়ে হাতাহাতিও হয়ে যায়, ডুয়েল লড়ার উপক্রম হয়, ছোরাবন্দুক বেরিয়ে পড়ে। তখন কাউন্সিলের কর্তারা ছুটে এসে দু-পক্ষকে থামায়, সালিশি বসায়, গোলমাল মেটায়। এমনভাবেই দিন যায় দিন আসে।
নিষ্ফল হতাশায় পাশে পিচিক করে একদলা থুথু ফেলে হাতের মজবুত লাঠিটা দিয়ে নিরীহ কাঁটাঝোপের গায়ে সজোরে আঘাত করে লরেন্স।
এখনও বৃষ্টি থামার কোনও লক্ষণ নেই। বিকেল পেরিয়ে গিয়েছে। আজ আর ঘর ছাওয়ার কাজ শেষ করা যাবে না। লরেন্স ও গ্রান্টের এই ঘর তৈরির পরিকল্পনা শুনে অনেকে আঁতকে উঠে বলেছে, ‘আরে ভাই খেপেছ নাকি?’
দিনের বেলাটা ডাঙায় কাটালেও রাতে জাহাজের ডেককেই নিরাপদ বলে মনে করে সাহেব-মেমরা। কারণ বন্য জন্তুর ভয়। বুনো শুয়োর, শেয়াল, হিংস্র বনবেড়াল এসব তো আছেই, তার উপরে রয়েছে বিষাক্ত সব সাপ। বাঘের দেখা যদিও এখনও পাওয়া যায়নি, তবে আশেপাশের জঙ্গল যেমন ঘন তাতে বাঘ থাকতেই পারে।
বন্য জানোয়ার ও সরীসৃপের ভয় যে গ্রান্ট ও লরেন্সের নেই তা নয়, তবু তারা ঠিক করেছে ঘর ছেয়ে ডাঙাতেই আলাদা থাকবে দুজনে। ঘরের বাইরে রাতে আগুন জ্বেলে রাখবে, পালা করে একজন বন্দুক নিয়ে পাহারা দেবে। জাহাজের ডেকে গাদাগাদি করার চেয়ে এ ঢের ভালো, তাও তো একরকম ডিগনিটি নিয়ে বাঁচা যাবে।
কিন্তু এমন তো হওয়ার ছিল না। বেঁচে থাকার জন্য এই কঠিন জীবন সংগ্রাম তাদের করার কথা নয়। কলকাতায় বেশ সুখেই তো ছিল তারা। কে ভেবেছিল, ওই শহর থেকে সহসা উৎখাত হয়ে উদ্বাস্তু হতে হবে…।
পাশেই ফেলে রাখা কচুপাতার উপর গাছের পাতা ধোয়া জল যন্ত্রের মতো নির্দিষ্ট ছন্দে টুপটুপ শব্দে এসে পড়ছে আর পিছলে যাচ্ছে। সে দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পুরোনো কথা মনে পড়ে গেল লরেন্সের।
গ্রান্ট ও সে, দুই বন্ধু। ইয়র্কশায়ারে পাশাপাশি বাড়ি। লেখাপড়া সামান্য। লন্ডনে এসেছিল কাজের খোঁজে। ভবঘুরের মতো পথে পথে ঘুরে বেড়াত দুজনে। হঠাৎ এক দালালের সঙ্গে আলাপ। বেঙ্গলে পাড়ি দেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ, লোক চাই। সেই দালালই তাদের নিয়ে গেল কোম্পানির এক বড়কর্তার কাছে। কাজের জন্য মনোনীত হল তারা। দুই বন্ধুর সে কী উল্লাস! ততদিনে বাংলা মুলুকের হালহকিকত, ওদেশে টাকা রোজগারের মন্ত্রগুপ্তি লন্ডনে বসেই অনেকের মুখে শোনা হয়ে গিয়েছে দুজনের।
বেঙ্গল হল সোনার দেশ। ওখানে একবার গিয়ে পড়তে পারলে আর ভাবনা নেই। শুধু রোগব্যাধির হাত থেকে বাঁচলেই হল। একেবারে লাটবেলাট হয়ে দেশে ফেরা যাবে। কথাটা বড় একটা মিথ্যে নয়। বেঙ্গলে গিয়ে অনেক ছাপোষা লোকের রাতারাতি বড়লোক হয়ে ওঠার হওয়ার কিসসা লরেন্স ও গ্রান্ট জানে।
বেঙ্গলের পথেঘাটে নাকি ছড়িয়ে আছে রমণীরত্ন। এই দিশি মেয়েরা বেশ নরমসরম, একটু লাজুক প্রকৃতির হলে কী হবে, নানারকম ছলাকলা জানে, পুরুষের মন বোঝে। ওদেশে রতিসুখের কোনও অভাব নেই। এছাড়া আছে দিশি মদ। দামে সস্তা, খুব সুস্বাদু।
আর মাইনে? কোম্পানি যা দেবে তাতে অবশ্য ঘটি ডোবে না, বাবুগিরি ফলানো যায় না, কিন্তু রোজগারের অন্য পথ আছে। উপরি আয়ের কায়দাটা রপ্ত করে নিতে পারলেই হল। তখন মাইনের টাকায় হাতই দিতে হবে না। কোম্পানির দস্তক অপব্যবহার করে লুকিয়ে চুরিয়ে ব্যবসা চালিয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠাও খুব একটা কঠিন নয়। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে যত খুশি মুনাফা লোটা যায়।
‘টাকা, মদ, মেয়েছেলে সবই নাগালের মধ্যে। মরদের আর কী চাই?’ বেঙ্গলে আসার আগে লরেন্সকে একথা বলেছিল টনি। কোম্পানির চাকরিতে দশ বছর বেঙ্গলে কাটিয়ে সে লন্ডনে ফিরেছে বছরখানেক আগে। সে ভুল কিছু বলেনি। কলকাতায় এসে লরেন্স ও গ্রান্ট টাকা-মদ-মেয়েছেলে সব কিছুরই স্বাদ পেয়েছিল।
লরেন্সের মনে পড়ে হিরেমনের কথা। এই গোলমালে তার কী হল কে জানে। দু’কলি বেশ গাইত মেয়েটা। গানের কথার মানে বুঝত না লরেন্স, কিন্তু সুর লেগে আছে কানে। সুতানুটিতে গঙ্গার পাড়ে হিরেমনের হোগলার বেড়ার ঘরে লরেন্স অনেক রাত কাটিয়েছে। কয়েকবার মেয়েটাকে নৌকোয় তুলে নিয়ে গিয়ে ফুর্তিও করেছে। মেয়েটা জানে কী করে সোহাগ করতে হয়।
লরেন্সের ইচ্ছে ছিল কলকাতা ছেড়ে পালানোর সময় হিরেমনকে সঙ্গে নেয়। আরও দুয়েকজন বাঁধা মেয়েমানুষ সঙ্গে নিতে চেয়েছিল।
এই প্রস্তাব শুনে গভর্নর ড্রেক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ফরমান জারি করেন, ‘নিজেদেরই থাকার জায়গা হচ্ছে না, এর মধ্যে নেটিভ বেশ্যা জুটিয়ে উৎপাত বাড়ানো চলবে না।’
বিলিতি বউ যাদের রয়েছে, তারা দিব্যি বিবিসমেত জাহাজে চড়ে বসল। দিশি বউ, উপবউ এরা পড়ে রইল। অবশ্য এ কথাও তো ঠিক, সব সাহেব-মেম যে কলকাতা ছেড়ে পালাতে পেরেছিল, তা তো নয়। সামান্য কয়েকটা জাহাজে কত আর লোক ধরে?
কলকাতা ছেড়ে পালানোর সময়, জাহাজে ওঠার জন্য সে কী হুড়োহুড়ি! কতজন যে পায়ের চাপে মরেছে কে জানে? ট্রেভর ছিটকে পড়ল জলে। হেল্প! হেল্প! বলতে বলতে তলিয়ে গেল। এ লরেন্সের নিজের চোখে দেখা।
এ অবস্থায় শখের দিশি মেয়েমানুষ নিয়ে পালানোর কথা ভাবাটা কি বাড়াবাড়ি রকমের বিলাসিতা নয়? তবু লরেন্সের মন মানে না। হিরেমন তো শুধু তার কাছে কড়ির বিনিময়ে ভোগের মেয়েমানুষ ছিল না। শরীরের আরাম কিনতে গিয়ে হিরেমনের কাছে ভালোবাসায় বাঁধা পড়েছিল লরেন্স। হিরেমন গাইত। ঢুলু ঢুলু দুই চোখে তার দিকে চেয়ে থাকত লরেন্স। সে দৃষ্টি ভোগবিলাসীর নয়, আশিকের। বিষণ্ণ বিকেলে মেঘ থমথমে আকাশের দিকে চেয়ে হিরেমনের কথা ভেবে লরেন্সের বুকটা হু-হু করে ওঠে।
নবাব সিরাজদ্দৌলার এক হামলার ঝটকায় এলোমেলো হয়ে গেল সব কিছু। এজন্য একটা লোকই দায়ী। দ্য অনারেবল গভর্নর অফ কলকাতা কাউন্সিল। রজার ড্রেক। লরেন্স, গ্রান্টসহ কোম্পানির আরও অনেক সাধারণ কর্মচারী একথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে।
নিষ্ফল আক্রোশে জোরের সঙ্গেই বলে ওঠে লরেন্স, ‘রজার ড্রেক, দ্য স্কাউন্ড্রেল!’
সায় দেয় গ্রান্ট, ‘সন অফ অ্যা বিচ। কী দরকার ছিল নবাবের সঙ্গে গোলমাল পাকানোর? লড়ার মুরদ নেই, ওদিকে নবাবের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে যাওয়া।’
কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে জুতোর তলায় আটকে থাকা কাদার দলা পরিষ্কার করতে করতে লরেন্স বলে, ‘স্টুপিড! আ ডাল হেডেড ফেলো। নবাবের সঙ্গে লড়াই করা তো কোম্পানির পলিসি নয়।’
‘কোম্পানির চাকরি নেওয়ার সময় এমন তো কোনও শর্ত ছিল না যে বনেজঙ্গলে এসে লুকিয়ে থাকতে হবে। অনারেবল মিঃ ড্রেক টোটালি মিসহ্যান্ডেল্ড দ্য সিচুয়েশন।’ এই বলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে নদীর দিকে তাকায় গ্রান্ট।
বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে চোখে পড়ছে ফোর্ট উইলিয়ামের আবছা অবয়ব। উদ্বাস্তু ইংরেজদের একমাত্র সম্বল।
এই ফোর্ট উইলিয়াম কলকাতার সাধের দুর্গ নয়, জাহাজের নাম। একূল-ওকূল ভেসে যাওয়া ইংরেজদের কাছে এই ফোর্ট উইলিয়াম যেন নোয়ার নৌকো। নবাব সিরাজদ্দৌলার রোষ থেকে বাঁচতে এই জাহাজে চড়ে কলকাতা থেকে ফলতায় পালিয়ে এসেছে ইংরেজ বণিকরা।
কলকাতা থেকে মাইল চল্লিশেক দূরে গঙ্গার বাম তীরে ফলতা এক ছোট্ট গ্রাম, বনজঙ্গলে ঘেরা। বর্ষার জল পেয়ে জঙ্গল আরও আগ্রাসী হয়ে উঠছে দিন দিন। উচ্ছৃঙ্খলভাবে বেড়ে উঠছে গাছপালা ও বুনোঝোপ।
এক সময় ডাচদের ছোট একটা আস্তানা ছিল এখানে। কিছু মাটির ঘরদোর ছিল। সেসব এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই বাদাবনে, খোলা আকাশের নীচে সাহেবদের ঘরসংসার। মাথার উপর ছাদ নেই। পানীয় জলের অভাব। দিনে ডাঙায় নেমে হাত-পা ছড়ায় ইংরেজরা। সন্ধে হতে না হতেই বুনো জানোয়ারের ভয়ে সব জাহাজের ডেকে এসে জড়ো হয়। কোন্দল করে।
আশেপাশে কয়েকঘর মানুষের বসবাস আছে। এরা চাষ-আবাদ করে, শালতি নিয়ে নদীতে মাছ মারে। জঙ্গলে গিয়ে মৌচাক ভেঙে নিয়ে আসে। চাক পিষে মধু বের করে। মোম তৈরি করে। হঠাৎ এসে পড়া এই লালমুখো সাহেবদের এরা এড়িয়ে চলে। ধারেকাছে বড় একটা ঘেঁষে না। জমিদারের নিষেধ আছে—নবাবের সঙ্গে গদ্দারি করেছে ইংরেজরা, প্রজারা কেউ যেন তাদের মদত না দেয়।
‘ও মাই গড!’ হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় গ্রান্ট।
তার ডান পায়ে হাঁটু পর্যন্ত মোড়া চামড়ার জুতোর গা বেয়ে চুপিসাড়ে উপরের দিকে উঠছে একটা গোখরো সাপ। লরেন্স ও গ্রান্টের কাছে অচেনা নয় সাপটা। ওরা এটাকে কিং কোবরা বলে জানে। এ সাপ বেঙ্গলের পথেঘাটে প্রায়ই দেখা যায়। এক ছোবলেই একটা মানুষকে সাবাড় করে দিতে পারে!
আতঙ্কে গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে পা ঝাড়া দেয় গ্রান্ট। সাপটা ছিটকে পড়ে পাশে। লাঠি হাতে তেড়ে যায় লরেন্স। সাপের নাগাল পায় না। সাপটা চকিতে বুনো ঝোপের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়। সাক্ষাৎ মৃত্যুর দূতকে নিকেশ করার জন্য লাঠি চালিয়ে বুনো ঝোপ তোলপাড় করতে শুরু করে লরেন্স। না, কিং কোবরার দেখা পাওয়া যায় না।
কপালের ঘাম মোছে গ্রান্ট।
বৃষ্টি ধরেছে। শ্রাবণের মেঘ সরে গিয়েছে। বিকেল শেষের পশ্চিমাকাশে এখন নানা রঙের খেলা। পাখিরা ঘরে ফিরছে। বটগাছটায় জড় হয়েছে অনেক পাখি। তাদের কিচিরমিচির শব্দে কানপাতা দায়। পাখির ডাকের শব্দে ফাঁদের কথা মনে পড়ল লরেন্সের। সকালে এসে পাখি ধরার জন্য জঙ্গলে ফাঁদ পেতে রেখেছে তারা।
লরেন্স বলল, ‘চলো জন, কী পাখি পড়ল দেখি। আজ রাতে রোস্ট খাওয়া যাবে।’
লাঠি দিয়ে ঝোপঝাড় ঠেলে এগোতে থাকে লরেন্স ও গ্রান্ট। ভিজে মাটিতে মাঝে মাঝে এঁটে যাচ্ছে জুতো। পা হড়কে যাচ্ছে।
জালের কাছে পৌঁছে হতাশ হয় দুজনে। একটা পাখিও ধরা দেয়নি। বিফল মনোরথে জাল গোটাতে থাকে লরেন্স।
গ্রান্ট মুচকি হেসে বলে, ‘ইভেন বার্ডস আর মোর ইনটেলিজেন্ট দ্যান আওয়ার গভর্নর, মিঃ ড্রেক।’
হঠাৎ ঝোপের মধ্যে সরসর একটা শব্দ শুনে ঘুরে তাকায় লরেন্স ও গ্রান্ট। দুজনেরই স্নায়ু টানটান হয়ে ওঠে। বড়সড় কোনও জন্তু জঙ্গল ভেদ করে সন্তর্পণে এগোচ্ছে। এবার পাতার ফাঁকে জন্তুটার লোমশ দেহটা নজরে আসে গ্রান্টের। সে চিৎকার করে ওঠে সে, ‘ওয়াইল্ড বোর!’
লরেন্সের কাঁধে রয়েছে দোনলা বন্দুক, কিন্তু প্রবল আতঙ্কে বন্দুকের কথা ভুলে গিয়ে পাখির জাল ফেলে রেখে বনজঙ্গল ভেঙে ছুটতে শুরু করে লরেন্স ও গ্রান্ট। তাদের লক্ষ্য করে ছুটে আসা দাঁতাল ভয়ংকর বুনো শুয়োরটা পাখি ধরার জালে পা বেঁধে মাটিতে পড়ে গিয়ে বিশ্রি চিৎকার করতে থাকে।
শুয়োরের চিৎকার শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে দুজনে। বন্দুক বাগিয়ে ধরে লরেন্স।
কয়েক পা পিছিয়ে এসে দুজনে দেখে জালে জড়িয়ে গিয়েছে শুয়োরটার সামনের দুই-পা। দাঁত দিয়ে জাল কাটার আপ্রাণ চেষ্টা করছে জানোয়ারটা।
বন্দুক তাক করে ট্রিগার টিপে দেয় লরেন্স। নির্ভুল নিশানা। গুলিবিদ্ধ হয়ে ভয়ানক আর্তনাদ করে ওঠে শুয়োরটা। তারপর থরথর করে একবার কেঁপে উঠে নিথর হয়ে যায়। তাজা লাল রক্তে ভিজে ওঠে সাঁঝবিকেলে কালচে সবুজ হয়ে আসা বনভূমি।