শাকম্ভরীর দ্বীপ
শাকম্ভরীর দ্বীপ
৬
যখন সুমনারা ছবি দেখছিল ঠিক সেই সময়ে থিয়েটার রোডের একটা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে কেয়ার টেকারের সঙ্গে কথা বলছিল একটি যুবক। দেখলেই বোঝা যায় ধনী। যুবকটির মুখ একটু গম্ভীর, বিষণ্ণ। পাশে যে যুবতী দাঁড়িয়ে ছিল তার রূপ আগুনের মতো। তার চেহারাতেও বিষাদ মাখানো। যুবকটির নাম সৌভিকনারায়ণ মুখার্জি। মেয়েটি তেজস্বিনী ভাটিয়া, এখন মুখার্জি।
বিরাট হলঘরের একদিকটা পুরো কাচ দিয়ে ঢাকা। সৌভিক গিয়ে স্লাইডিং ডোর সরালো অমনি গরাদহীন জানলা পথে হু হু করে হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিতে লাগলো তাদের চুল, তেজস্বিনীর আঁচল। ফুলশুদ্ধু একটা ফুলদান কেঁপে উঠলো। সৌভিক বললো— কী হাওয়া দেখেছো! তুমি তো এ ফ্ল্যাটে কখনও আসোনি।
তেজস্বিনী বললো— আমি একটু আনপ্যাক করি!— সে চলে গেল… পেছন থেকে তাকে উদ্বিগ্ন মুখে দেখে সৌভিক। তারপর সোফায় এসে বসে। একটু পরে কেয়ারটেকার ট্রে হাতে ঢোকে। টেবিলে নামিয়ে রেখে বলে— সব ঠিক তো সাহেব!
ঠিক আছে।
মেমসাব?
চান করতে ঢুকেছেন বোধহয়। বিরক্ত করো না। পরে দরকার হলে গরম আরেক পট দিও।
ঘাড় নেড়ে লোকটি চলে গেল। সৌভিক কফি ঢাললো কাপে। দু এক চুমুক খেয়ে নামিয়ে রাখলো কাপটা।
বিশাল হলঘরে নানান অলংকরণ। স্কাল্পচার, পেন্টিং। প্রত্যেকটাই অপূর্ব। সৌভিক উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে থাকে। আস্তে আস্তে চলে যায় জানলার কাছে। স্লাইডিং পাল্লা খুলে কোমর অবধি ঝুঁকে নিচের দিকে দেখে। ওহ ইটস ডেঞ্জারাস। পরক্ষণেই চমকে ওঠে। পেছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। চট করে ঘুরে দাঁড়ায়। ওহ তুমি
তেজস্বিনী এখন একটা হলুদ হাউজকোট পরে দাঁড়িয়ে আছে। তার খোলা চুলে জলের আভাস। বললো— তুমি কি ভেবেছিলে ভূত? না খুনী?
ওফ্ জিনি। তুমি এমন একেকটা কথা বলো না! কফি খেয়েছো?
তেজস্বিনী ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বললো।
স্লাইডিং পাল্লা সামান্য খুলে রেখে সৌভিক বললো— লম্বা ড্রাইভ। খুব টায়ার্ড লাগছে। একটু রেস্ট নিয়ে নিই। কী বলো?
আমি আবার কী বলবো? টায়ার্ড লাগলে রেস্ট নিতে হবে। বাস। বলাবলির কী আছে?
সৌভিক বললো— পুরো রাস্তাটা আমি একা ড্রাইভ করলাম। তুমি একটু হেল্প করলে পারতে।
তেজস্বিনী বললো— এত খারাপ রাস্তায়? অভ্যেস নেই।
সৌভক কেমন অর্থপূর্ণভাবে বললো— অভ্যেস থাকে না। করে নিতে হয় অনেক সময়ে। আসল কথা ইচ্ছে। আর সাহস।
তেজস্বিনী বললো— রাইট। আমার ইচ্ছে হলে করবো। নইলে নয়। আর সাহস? আই হ্যাভ প্লেড উইথ টাইগার কাবস্।
সৌভিক এবার হাসলো— কাবস্? গ্রোন-আপ তো নয়।
তেজস্বিনী বললো— আর য়ু শিওর?
সৌভিক তাড়াতাড়ি বললো— এনিওয়ে কোথায় বেড়াতে যাবে বলো!
— এই তো এলাম! এসেছি তো!
আই মীন পোস্ট-ম্যারেজ বেড়ানো। এটা তো আফট্রল আমার কাজের জায়গা।
যেখানে তোমার ইচ্ছে।
তোমার কোনও বিশেষ ইচ্ছে নেই?
আমার ইচ্ছে অনিচ্ছের দাম কী! ডেসটিনি। মেনে নিয়েছি।
এবার সৌভিক কেমন কাতর গলায় বললো— জিনি। তুমি কেন আমার ওপর রেগে আছো?
রাগবো কেন? তোমারই বা কী দোষ?— তোমারও ওই, ডেসটিনিই! সৌভিক বললো— আমি ওভাবে ব্যাপারটা দেখছি না কিন্তু। নিয়তি ভবিতব্য… নো। বিশ্বাস করো আমি অতীত একেবারে মুছে ফেলবো। তোমাকে আমি সুখী করবোই আমার প্রতিজ্ঞা।… অবশ্য তুমি যদি চাও।
আর না চাইলে?
সৌভিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর বললো— আমার দিক থেকে সেন্ট পার্সেন্ট চেষ্টা থাকবে। বনের প্রাণীও তো স্নেহ-ভালোবাসায় বশ হয়…ফিরে ভালোবাসে…তারপর…তার…পর…ওই ডেসটিনি।
তেজস্বিনী অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ কি রকম মরিয়ার মতো বলে উঠল— আমাকে কোনও নির্জন সুন্দর জায়গায় নিয়ে যেতে পারো?
সৌভিক উৎসাহিত হয়ে বললো— সেটাই তো বলছি। একটু ভাবো। আমি চান করে আসি।
সৌভিক চলে যায়। আলো জ্বলে না। অন্ধকারে তেজস্বিনী একা বসে থাকে। জানলার দিকে মুখ। আস্তে আস্তে চাঁদ ওঠে। হঠাৎ চাঁদের দিকে তাকিয়ে তীব্র গলায় তেজস্বিনী বলে ওঠে— আই হেট ইট। হেট হার, হেট দেম অল।
রাতে ঘুম নামে। শহর জুড়ে ঘুম। সৌভিক অনেকক্ষণ ধরে ছটফট করে। পাশে তেজস্বিনী একেবারে নিশ্চুপ, অনড়। একসময়ে দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ে। অস্ত যেতে যেতে চাঁদ বলে যায় হেট ইট, হেট হার, হেট দেম অল।
দশতলার ফ্ল্যাট। সকাল হতেই চতুর্দিক ঝলমল ঝলমল করতে থাকে। যানবাহনের আওয়াজ উঠে আসছে এই দশ তলাতেও। দুজনেই চান সেরে নিয়েছে। এসে বসলো। তেজস্বিনী একবার উঠে রান্নাঘরে গেল।
কী করছো জিনি? সৌভিক চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
আসছি!— ক্ষীণ গলা ভেসে আসে।
একটু পরে ব্রেকফাস্ট নিয়ে কেয়ার-টেকার আসে। তেজস্বিনী বসতে বসতে বলে— সৌভিক উপমা খাবে তো?
খাবো মানে? উপমা আই লাভ।
সেইজন্যেই। একটু করতে বললাম।— সে হাত বাড়িয়ে পট থেকে চা ঢালতে লাগলো।
সৌভিক নরম চোখে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। একটু পরে গলাটা ঝেড়ে নিয়ে আস্তে জিজ্ঞেস করলো— ভালো লাগছে?
কী?
জায়গাটা? এই ফ্ল্যাটটা? অনেক উঁচুতে তো! অন্যরকম…চারদিকে লোকালয়ের আওয়াজ… সাধারণ আই মীন নরম্যাল লাইফ…
তেজস্বিনী চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে বললো— জায়গাটা ভালো, ফ্ল্যাটটা ভালো আর সৌভিক…নিচু গলায় সে বললো— তুমিও ভালো।
সৌভিক বেশ কিছুক্ষণ অভিভূতভাবে বসে রইলো, তারপর তেজস্বিনীর হাতটা তুলে ধরে কিছুক্ষণ হাতের পাতায় গাল রাখলো। তারপর খুব সন্তর্পণে একটা চুমু খেলো। প্রায় ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করলো— কিছু ভাবলে? জিনি?
— কী বিষয়ে?
— ওই যে কোথায় যেতে চাও।
— বললাম তো নির্জন… সুন্দর… কেউ দেখবে না, শুনবে না, কাউকে ভয় করতে হবে না, মেনে চলতে হবে না।
ঠিক আছে। ঠিক আছে। ধরো ডালহৌসি এখনও খুব নির্জন। অরুণাচল প্রদেশ। নির্জনও সুন্দরও। কিন্তু কমফর্ট পাবে না। যদি বাইরে যেতে চাও তো হংকং সিঙ্গাপুর….
— ওহ্ নো। আচ্ছা আলমোড়ায় মায়াবতী আশ্রম বলে একটা জায়গা আছে না?
আছেই তো! মায়াবতী যাবে? শিওর। তোমার যেখানে ইচ্ছে সেখানে…
তেজস্বিনী উঠে দাঁড়ালো— তাহলে চলো।
সৌভিক স্নেহের হাসি হেসে বললো— আরে! এক্ষুনি? ট্রাভল এজেন্টের সঙ্গে কথা বলি! টিকেট বুক করি।
তেজস্বিনী গোঁয়ারের মতো বলে উঠলো— প্লেনে যাবো। কোথাও থামবে না। সোজা গিয়ে নামিয়ে দেবে বরফের মাঝখানে। কিম্বা কোনও পীকে। কী যেন আছে ওখানে? ত্রিশূল…নন্দাদেবী…বলতে বলতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললো। নিঃশব্দ কান্না। শরীরটা ফুলে ফুলে উঠছে।
সৌভিক উঠে দাঁড়িয়ে তার মাথায় হাত রাখলো— জিনি, কেঁদো না, প্লিজ, আমার কথাও একটু ভাবো। একটু। ঠিক আছে তোমাকে উনি জোর করেছেন। কিন্তু সে তো আমাকেও…টেক ইট স্পোর্টিংলি। একটু থেমে বললো— দ্যাখো না, একটু খোঁজখবর করি। তারপর তোমাকে নিয়ে আমি একেবারে বিদেশে চলে যাবো। য়ু’ল হ্যাভ আ নিউ লাইফ দেয়ার। নিউ। একেবারে ভুলে যাবে সব দুঃস্বপ্নের মতো। অন্তত চেষ্টাটা করার ভরসা আমায় দাও জিনি!
তেজস্বিনী সৌভিককে জড়িয়ে ধরলো। কাঁধে মাথা রেখে অঝোর ধারে কাঁদে বলে— সৌভিক য়ু অ্যান্ডস্টান্ড। ডোন্ট য়ু? ডোন্ট য়ু? সৌভিক তার মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দেয় যেন সে স্বামী নয়, দাদা।